১১:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ দীর্ঘ ৪ মাস যেভাবে সংরক্ষণ করা হলো

খামেনিকে নিয়ে যা জানা গেল

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ দীর্ঘ ৪ মাস যেভাবে সংরক্ষণ করা হলো

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়ার দীর্ঘ চার মাস পর অবশেষে আগামী ৯ জুলাই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। এই ঐতিহাসিক বিদায় অনুষ্ঠান ও দাফন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরানসহ গোটা ইরানে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাজপথ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে রেভল্যুশনারি গার্ডস এবং বাসিজ মিলিশিয়া বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য মোতায়েন করে পুরো দেশকে কার্যত একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র আওতায় তেহরানের একটি কম্পাউন্ডে শক্তিশালী বাঙ্কার-ব্লাস্টার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৩৬ বছর ধরে ইরান শাসন করা ৮৬ বছর বয়সী এই সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন। তবে তার মৃত্যুর দীর্ঘ চার মাস পর এই শেষকৃত্যের আয়োজন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক মৃত্যুর পর দ্রুত দাফনের বিধান রয়েছে এবং রাসায়নিকের মাধ্যমে মরদেহ মমিকরণ বা ‘এমবামিং’ করা নিষিদ্ধ। তাহলে দীর্ঘ চার মাস কীভাবে খামেনির মরদেহ সংরক্ষণ করা হলো— এমন প্রশ্নের জবাবে সন্ত্রাসবাদ ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ ওমর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে জানান, ‘ইসলামী বিধি অনুযায়ী কেমিক্যাল এমবামিং নিষিদ্ধ হওয়ায় তার মরদেহটি কোনো কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারে হিমায়িত করে রাখা হয়েছিল। শিয়া আইনে বিশেষ প্রয়োজনে এবং দেশের সর্বোচ্চ নেতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় ফতোয়ার মাধ্যমে এভাবে দীর্ঘ সময় মরদেহ হিমায়িত রাখার বৈধতা পাওয়া বেশ সহজ।

তবে ড. ওমর আরেকটি বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে বলেন, ‘যেহেতু খামেনি বাঙ্কার ধ্বংসকারী ভারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছিলেন, তাই তার মরদেহটি হয়তো অক্ষত অবস্থায় প্রদর্শন করার মতো অবস্থায় নেই। প্রশাসনের বারবার শিডিউল পরিবর্তন এবং কফিন জনসমক্ষে প্রদর্শন না করার সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয়— মরদেহটি সংরক্ষণ করা গেলেও তা দেখানোর উপযোগী ছিল না।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই শেষকৃত্যকে কেবল একটি বিদায় অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জানুয়ারির গণবিক্ষোভ দমনের পর দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও কঠোর জান্তার একটি শক্তিপ্রদর্শন হিসেবে দেখাতে চাচ্ছে। তেহরানের রাজপথে বড় বড় বিলবোর্ডে খামেনির ছবির পাশে স্লোগান লেখা হয়েছে— আমাদের অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে হবে।

ইরানের ‘শহীদ ফাউন্ডেশন’-এর সাংস্কৃতিক বিষয়ক প্রধান ও খামেনির শেষকৃত্য আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য ইয়াকুব সোলাইমানি জানিয়েছেন, আগামী শনি ও রোববার তেহরানের ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় জনসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর ৬ জুলাই তেহরানে মূল কফিন মিছিল বা জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে স্থানীয় প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষ সমবেত হতে পারে। এরপর শিয়াদের পবিত্র নগরী কোম এবং মাশহাদে পর্যায়ক্রমে জানাজা শেষে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে তাকে দাফন করা হবে।

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির চরমপন্থা বিষয়ক গবেষকদের মতে, ইরান সরকার খামেনির জানাজায় দেশব্যাপী ৩৫ কোটি মানুষের সমাগম এবং ৯০টি দেশের প্রতিনিধির উপস্থিতির যে পরিসংখ্যান প্রচার করছে, তা আসলে বিশ্বমঞ্চে তাদের টিকে থাকার বার্তা। যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পর দেশটির বর্তমান শাসকগোষ্ঠী প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা এখনো কতটা শক্তিশালী।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

Demo Two

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ দীর্ঘ ৪ মাস যেভাবে সংরক্ষণ করা হলো

খামেনিকে নিয়ে যা জানা গেল

প্রকাশিত সময় ০২:৫৯:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়ার দীর্ঘ চার মাস পর অবশেষে আগামী ৯ জুলাই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। এই ঐতিহাসিক বিদায় অনুষ্ঠান ও দাফন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজধানী তেহরানসহ গোটা ইরানে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাজপথ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে রেভল্যুশনারি গার্ডস এবং বাসিজ মিলিশিয়া বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য মোতায়েন করে পুরো দেশকে কার্যত একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র আওতায় তেহরানের একটি কম্পাউন্ডে শক্তিশালী বাঙ্কার-ব্লাস্টার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৩৬ বছর ধরে ইরান শাসন করা ৮৬ বছর বয়সী এই সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন। তবে তার মৃত্যুর দীর্ঘ চার মাস পর এই শেষকৃত্যের আয়োজন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা কৌতূহল ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক মৃত্যুর পর দ্রুত দাফনের বিধান রয়েছে এবং রাসায়নিকের মাধ্যমে মরদেহ মমিকরণ বা ‘এমবামিং’ করা নিষিদ্ধ। তাহলে দীর্ঘ চার মাস কীভাবে খামেনির মরদেহ সংরক্ষণ করা হলো— এমন প্রশ্নের জবাবে সন্ত্রাসবাদ ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ ওমর মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে জানান, ‘ইসলামী বিধি অনুযায়ী কেমিক্যাল এমবামিং নিষিদ্ধ হওয়ায় তার মরদেহটি কোনো কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারে হিমায়িত করে রাখা হয়েছিল। শিয়া আইনে বিশেষ প্রয়োজনে এবং দেশের সর্বোচ্চ নেতার ক্ষেত্রে ধর্মীয় ফতোয়ার মাধ্যমে এভাবে দীর্ঘ সময় মরদেহ হিমায়িত রাখার বৈধতা পাওয়া বেশ সহজ।

তবে ড. ওমর আরেকটি বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে বলেন, ‘যেহেতু খামেনি বাঙ্কার ধ্বংসকারী ভারী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছিলেন, তাই তার মরদেহটি হয়তো অক্ষত অবস্থায় প্রদর্শন করার মতো অবস্থায় নেই। প্রশাসনের বারবার শিডিউল পরিবর্তন এবং কফিন জনসমক্ষে প্রদর্শন না করার সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয়— মরদেহটি সংরক্ষণ করা গেলেও তা দেখানোর উপযোগী ছিল না।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই শেষকৃত্যকে কেবল একটি বিদায় অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জানুয়ারির গণবিক্ষোভ দমনের পর দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও কঠোর জান্তার একটি শক্তিপ্রদর্শন হিসেবে দেখাতে চাচ্ছে। তেহরানের রাজপথে বড় বড় বিলবোর্ডে খামেনির ছবির পাশে স্লোগান লেখা হয়েছে— আমাদের অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে হবে।

ইরানের ‘শহীদ ফাউন্ডেশন’-এর সাংস্কৃতিক বিষয়ক প্রধান ও খামেনির শেষকৃত্য আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য ইয়াকুব সোলাইমানি জানিয়েছেন, আগামী শনি ও রোববার তেহরানের ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় জনসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর ৬ জুলাই তেহরানে মূল কফিন মিছিল বা জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে স্থানীয় প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষ সমবেত হতে পারে। এরপর শিয়াদের পবিত্র নগরী কোম এবং মাশহাদে পর্যায়ক্রমে জানাজা শেষে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে তাকে দাফন করা হবে।

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির চরমপন্থা বিষয়ক গবেষকদের মতে, ইরান সরকার খামেনির জানাজায় দেশব্যাপী ৩৫ কোটি মানুষের সমাগম এবং ৯০টি দেশের প্রতিনিধির উপস্থিতির যে পরিসংখ্যান প্রচার করছে, তা আসলে বিশ্বমঞ্চে তাদের টিকে থাকার বার্তা। যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পর দেশটির বর্তমান শাসকগোষ্ঠী প্রমাণ করতে চাইছে যে তারা এখনো কতটা শক্তিশালী।